Sunday, September 23, 2012

নিজেকে জানুন (৩য় পর্ব): ভূমিকম্প- পূর্বসতর্কতা এবং একটি Earthquake Kit

ভূমিকম্প একটি অতর্কিত, প্রধান এবং ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। কোন প্রকার পূর্বাভাস না দিয়েই খুব অল্প সময়ের ভেতর একটি জনপদ ধ্বংস করে দেওয়ার মত ক্ষমতা রাখে এই দুর্যোগ। এর সংজ্ঞা এবং উৎপত্তির কারণ আমাদের কমবেশি সবার জানা আছে, এ নিয়ে তাই বিশদ ব্যাখ্যায় যাচ্ছি না। শুধু এটুকু উল্লেখ করতে চাই, সারা পৃথিবীজুড়ে ভূমিকম্প-উপদ্রুত কিছু বিশেষ এলাকা (earthquake belt) চিহ্নিত করা হয়েছে এবং বাংলাদেশ এর বাইরে নয়। নীচের ছবিটিতে red zone area সেই earthquake belt এর আওতায় বাংলাদেশের প্রধান উপদ্রুত এলাকাগুলো নির্দেশ করছে। zone 2 এবং zone 3 ও নিরাপদ নয় ।



নীচের ছবিটি বাংলাদেশের seismic conditions আরও সুক্ষভাবে বুঝতে সাহায্য করবে -



ধরুন, ভূমিকম্প সংঘটিত হলো । এর অব্যবহিত পরেই আশা করতে পারি না যে আমার প্রয়োজন অনুযায়ী সাহায্য আমি তৎক্ষণাৎ পেয়ে যাব। যে কোন জরুরী অবস্থার জন্য সবার কিছু পূর্বপ্রস্তুতি থাকা একান্তভাবেই গুরুত্বপূর্ণ।পরীক্ষা দিতে গেলাম প্রিপারেশান ছাড়া, মাথায় মুহুর্মুহু বাজ পড়া ছাড়া আর কিছু চিন্তাই করা যাবে না সেক্ষেত্রে। তেমনি দুর্যোগ -পূর্ব সতর্কতা আমাদেরকে মানসিক শক্তি বজায় রাখতে সাহায্য করবে। দুর্যোগ-পরবর্তী অন্ততঃ প্রথম ৭২ ঘন্টার জন্য কিছু পরিকল্পনা কিভাবে আগে থেকে নেয়া যায় চলুন দেখা যাক।

নিম্নলিখিত ধাপগুলি আপনাকে ভূমিকম্পসহ যে কোন জরুরী অবস্থার জন্য প্রস্তুত হতে সাহায্য করবে-

১। আপনার শহরের বাইরের একজন ব্যক্তিকে দুর্যোগ-পরবর্তী যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে নির্ধারণ করুন। এমন কাউকে নির্বাচন করুন যিনি অন্য কোন শহরে বসবাস করেন। আমরা আশা করতে পারি যে দূরত্বের কারণে হয়ত তিনি একই দুর্যোগ দ্বারা প্রভাবিত হবেন না ।আত্মীয়, বন্ধু, শুভাকাংখী-যে কেউ হতে পারেন তিনি। তাকে আপনার নিকট আত্মীয়স্বজনের নাম এবং যোগাযোগের নম্বর দিয়ে রাখুন। আপনার পরিবারের সব সদস্যকে নির্দেশনা দিয়ে রাখবেন বিশেষ পরিস্থিতিতে সেই ব্যাক্তির সাথে যেন সবাই যোগাযোগ করে নিজ নিজ বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করে। সেই ব্যাক্তি হবেন আপনাদের Contact point. প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোতে মোবাইলের নেটওয়ার্ক নাও পেতে পারেন, তাই ল্যান্ডফোনের কথাও মাথায় রাখুন। যে কোন দুর্যোগের পরপর লোকাল ফোনযোগাযোগ সুবিধার থেকে লং ডিস্ট্যান্স ফোন পরিসেবার পুনরুদ্ধার সাধারনতঃ তাড়াতাড়ি হয়।

২। আপনার গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রগুলোর ফটোকপি করে কপিগুলো বিশ্বাসযোগ্য কোন ব্যক্তির কাছে বা ব্যাঙ্কে ডিপোজিট বক্সে রাখুন । পাসপোর্ট, ড্রাইভার লাইসেন্স, সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড, দলিলপত্র , যে কোন গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক বিবৃতি, বীমা তথ্য, বিয়ের লাইসেন্স এবং চিকিৎসার ব্যবস্থাপত্র ইত্যাদি এতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

৩।আপনার বাসায় দামি জিনিসপত্রের (যেমন দামি গয়না, ইলেক্ট্রনিক্স, শো-পিস ইত্যাদি)একটা তালিকা তৈরি করুন। লিখিতভাবে এবং সেইসাথে ফটোগ্রাফ অথবা ভিডিও করে রাখুন সেই জিনিসগুলোর। আপনার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রের সঙ্গে (২ নম্বর দ্রষ্টব্য) এই তথ্য একসাথে রাখুন।

৪। আপনার পরিবারের সবাইকে এই পরিকল্পনায় যুক্ত করুন। তাদের সবাইকে ১,২,৩ এবং ৫ নম্বর সম্পর্কে অবহিত করুন।বাড়ী নির্মাণের সময় কিভাবে একে ভূমিকম্পবান্ধব করা যায় সে সম্পর্কে ইঞ্জিনীয়ারদের কাছ থেকে জানুন। উন্নত দেশগুলোর স্কুলে, অফিসে, বাসায় প্রতি ৬ মাসে/এক বছরে একবার হলেও ফায়ার ডিপার্টমেন্ট থেকে আগুন আর ভূমিকম্পের ড্রিল প্রশিক্ষণ উৎসাহিত করা হয়। আগুন আর ভূমিকম্পে ঘরের ভেতর কোথায়, কোন শারীরিক ভঙ্গিতে অবস্থান নেয়া অপেক্ষাকৃত নিরাপদ, ভেতরে কতটুকু সময় আপনি পাচ্ছেন, কিভাবে-কখন ঘর থেকে বের হতে হবে, পরবর্তী করণীয় কি-এ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দেয়া এই ড্রিলের লক্ষ্য। স্বপ্রণোদিত হয়ে যে কেউ কর্মক্ষেত্রে বা স্কুলে এই ড্রিল প্রশিক্ষন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করতে পারেন। স্থানীয় রেডক্রস সোসাইটি এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। ভূমিকম্পের প্রেক্ষাপটে আপনার কর্মক্ষেত্র/বাসায় কোন জায়গাটি নিরাপদ, কোন জায়গাটি ভয়ঙ্কর তা জেনে নিন ।

৫। একটি দুর্যোগবান্ধব ইমারজেন্সী সরবরাহ ব্যাগ (Disaster Supply Kit) তৈরি করুন । দুর্যোগ-পরবর্তী অন্ততঃ ৩ দিনের জন্য আপনার নিজের এবং আপনার পরিবারের জন্য ইমারজেন্সী কি কি দরকার হতে পারে তার একটা তালিকা করুন। পরিকল্পনায় পরিবারের সদস্যদের সবার কথা মাথায় রাখতে হবে। সদস্যসংখ্যা বেশী হলে একাধিক ব্যাগ বানাতে হবে, তবে সব ব্যাগে যেন একইজাতীয় জিনিস থাকে। এর কারণ হল সব সদস্য দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে একইসাথে সারাক্ষণ অবস্থান করবেন তার কোন গ্যারান্টি নেই। কিটটিকে হতে হবে সবার জন্য বহনযোগ্য, এরজন্য বেশী ভারী যাতে না হয়ে পড়ে খেয়াল রাখবেন। বৃদ্ধা মা থেকে অবোধ শিশুর বিশেষ চাহিদা- সব বিবেচনা করে এটি আপনাকে বানাতে হবে। আপনার মেইনডোরের পাশে সবার জন্য সহজে প্রবেশযোগ্য কোন স্থানে সেই দুর্যোগ কিট সংরক্ষণ করবেন। উপরের ৪ নম্বরের ক্ষেত্রে এই কিটটি নিয়ে ঘর থেকে বের হওয়া প্র্যাকটিস করতে হবে। আপনার কর্মক্ষেত্র বা গাড়ির জন্যও এরকম কিট বানাতে পারেন। মাঝেমাঝে পেরিশবল আইটেমগুলোর মেয়াদ চেক করে তা ব্যবহার করে ফেলবেন এবং সেইসাথে আবার ব্যাগের ঘাটতিপূরণ (replenish) করবেন।



কিট নির্মাণে যা যা অন্তর্ভুক্ত করা উচিত তার একটা প্রাথমিক ধারণা এখান থেকে পাবেন:

-একটি ব্যাগপ্যাক
-পরিবারের সদস্যসংখ্যা হিসেবে তিনদিনের জন্য পর্যাপ্ত পানি (বোতলজাত)
-শুকনো খাবার যেমন বিস্কুট, মুড়ি, স্ন্যাকবার জাতীয় খাদ্য
-ফার্স্ট এইড কিট ও নির্দেশাবলী (স্যালাইন, এন্টিসেপ্টিক, ব্যান্ডেজ, ছোট কাঁচি, এজমা রোগীর ইনহেলার ইত্যাদি)
-কিছু নগদ টাকা
-গুরুত্বপূর্ণ ফোন নম্বর, টর্চলাইট, ছোট রেডিও ( ব্যাটারি পরিচালিত),ব্যাটারি, ডাস্ট মাস্ক
-শক্ত জুতা, একসেট কাপড়, প্লাস্টিক রেইন কোট, কম্বল বা স্লিপিং ব্যাগ
-ভারি গ্লাভস, all-purpose ছুরি, ছোট শাবল/হাতুড়ি, টেপ, দড়ি, রেডিও
-ব্যক্তিগত টয়লেট পেপার, মেয়েলি সরবরাহ, হাত sanitizer , সাবান
-শিশু বা অক্ষম বৃদ্ধমানুষের জন্য বিশেষ-প্রয়োজনীয় আইটেম ( চোখের চশমা, শ্রবণযন্ত্র বা অন্যান্য অত্যাবশ্যক ব্যক্তিগত আইটেম )
-বড় প্লাস্টিক ব্যাগ, বর্জ্য/ স্যানিটেশনের জন্য ছোট একটি প্লাস্টিকের বালতি।

(সাহায্যঃ ইন্টারনেট এবং অন্যান্য)

0 comments: